কেন এত নারী নির্যাতন?

খোন্দকার জিল্লুর রহমান :
বিচার হীনতার সাংস্কৃতি সবসময় অপরাধকে অনুপ্রানিত করে এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। গত বেশ কবছর থেকে আমাদের দেশে গুম, খুন. ধর্ষণ, ধর্ষনের পর হত্যা, গনধর্ষণ, আত্মহত্যা, রাহাজানি, চুরি, ডাকাতি, সরকারী সম্পদ দখল ও লুট, অর্থ পাচার প্রসাশনিক দুর্বলতা এবং ক্ষমতার অপব্যাবহার যেন একটা সাধারন নিয়মে পরিণত হয়েছে। যা অতীতের সকল রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গিয়েছে বললেও কমই হবে বলে মনে হয়। বিশেষ করে করোনা কালে ধর্ষণ, গনধর্ষণ, ধর্ষনের পর হত্যা, নির্যাতন সইতে না পেরে আত্মহত্যা. পরিবারিক কলহ, স্নায়ুবিক চাপ, সম্পর্কের টানাপোড়ন সহ নৈতিকতা ও মানবিক অব¯’ানগুলি একেবারেই তলানিতে এসে লেগেছে।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুর“র পর অন্যান্য সময়ের তুলনায় বাংলাদেশে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বেসরকারি সং¯’া এবং পুলিশ বাহিনী থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে এর পরিমাপ করা যায়। মহামারী শুর“র পর গত বছরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০ মাসে বিভিন্ন বয়সী নারী ও কন্যা শিশুর ওপর ধর্ষণের মতো নির্মম নির্যাতন চালানো হয়েছে, যা বিগত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি। এটা এতই উদ্বেগজনক যে বর্তমান সময়ে পুলিশ, বিভিন্ন সহযোগি সং¯’া এবং মানবাধীকার কমিশনের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বয়স্ক নারীর তুলনায় কন্যা শিশুদের ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বেশি, এর ভিতরে একক ধর্ষণ, গনধর্ষণ, কখনো কখনো প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে গিয়ে নির্দিষ্ট ¯’ানে দীর্ঘ সময় আটকে রেখে ধর্ষণ নির্যাতন সহ নারী বিচার প্রর্থীর দুর্বলতার প্রতি প্রসাশনের কারো কারো অনৈতিক সুযোগ আদায়ের ঘটনাও। অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগীকে ধর্ষণের পর নিজের এবং নিজেদের অপরাধ লুকানোর জন্য নির্মমভাবে হত্যাও লাশ গুমকরা হয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজের (ভুক্তভোগী) অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যাও করেছে।
মহামারীর আক্রমন এবং তার প্রায় বছরক্ষানিক পুর্ব থেকেই গুম, ক্ষুন, লুটপাট,ও ধর্ষনের ঘটনা ব্যাপক হারে বাড়লেও মহামারির সময় থেকে তা চরম থেকে চরমতর অব¯’ায় রূপ নেয় যা অতীতের সকল রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। বর্তমান সময়ে এই ধর্ষণের কারণ খুঁজতে গিয়ে মনোবিজ্ঞানী সমাজবিজ্ঞানী ও সূশীল ব্যাক্তিরা সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়কেই এর জন্য দায়ী বলে মতামত দেন। তাদের মতে, রাষ্ট্রে দুষ্টচক্রের রাহুগ্রাস অতিমাত্রায় বেড়ে যাওয়া, জবাবদিহীতার অভাব, প্রসাশনিক দুর্বলতা, আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহীনির অনৈতিকতা, অদক্ষতা ও অযোগ্যতা, দলীয়করন, বিচারহীনতার সাংস্কৃতি, নৈতিক অবক্ষয়, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকতে গিয়ে রাষ্ট্রিয় অবকাঠামোকে দুর্বল করে তোলাসহ সকল ক্ষেত্রে দলীয় রাজনীতিকরনের প্রভাব খাটানো, লোভ-লালসা ও অনেক ক্ষেত্রে নারীদের খোলামেলা চলাচলের কারনেই অপরাধীরা বেপরোয়া অব¯’ান নিয়েছে। শহর, নগর, গ্রাম-গজ্ঞ এক কথায় পুরো দেশেই হঠাৎ করে ধর্ষকদের এই বেপরোয়া আচরণের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা জানান, মাদকাসক্ত ব্যক্তি, দুর্বল ব্যক্তিত্ব ও হতাশাগ্র¯’ মানুষ এবং ক্ষমতার কারণে অহংকারী ব্যক্তিরা ধর্ষণের মতো অপকর্ম ঘটা”েছ বেশী। মূলত মহামারীতে জবাবদিহিতা কম থাকা, চাকুরি হারানো, কর্মহীন থাকা ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহীনির করনাকালিন সময়ে সীমিত দায়ীত্ব পালনের কারণে ধর্ষণের মতো অপরাধ বেড়ে যা”েছ। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে মোট ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ১৩টি। এ সময় মোট ২২৪ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। আর ধর্ষণের জন্য আত্মহত্যা করেন ১০ জন। অপরদিকে ২০২০ সালে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ধর্ষণের ঘটনা ঘটে ১ হাজার ৬২৭টি। এ সময় মোট ৩২৬ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। আর ধর্ষণের জন্য আত্মহত্যা করে ১৪ জন। অর্থাৎ ২০১৯ সালের চেয়ে বিদায়ী বছর অর্থ্যাৎ ২০২০ সালে মহামারী চলাকালেও ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা আর এজন্য আত্মহত্যা করার ঘটনা মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। নারী ও শিশুর ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহীনিও চিন্তিত। পুলিশ বাহিনীর কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, গত বছরের মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ধর্ষণের মামলা হয় সাড়ে ৪ হাজার যা আগের বছর ছিল ৪ হাজার ৩৩১টি। এ ছাড়াও করোনা সংক্রমণের এই সময় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বাইরে ঢাকা রেঞ্জের ১৭ জেলায় ৭৪৪টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। আর ডিএমপি এলাকায় হয়েছে ৩৭২টি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতে, করোনা মানুষকে কোণঠাসা করে ফেলছে, মানুষের এজন্য কোনো বিনোদন নেই, কোনো সামাজিক জীবন নেই, সামাজিক সম্পর্কগুলো ভেঙে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বলছে। আর এই বি”িছন্নতা, আত্মকেন্দ্রিকতা, কোণঠাসা করে রাখা, মানুষের মুখ বন্ধ করে দেওয়া এসবের জন্য দায়ী,এরই সাথে সারা বিশ্বে পুঁজিবাদের যে চরম অধঃপতনও এর জন্য দায়ী কম নয়। বিশেষ করে আমাদের বাংলাদেশেও এই দুই ক্ষেত্রে এ অধঃপতন দেখা যায়। একটি হ”েছ ধর্ষণের ক্ষেত্রে আরেকটি দুর্নীতিতে। ধর্ষণ আর দুর্নীতি কিš‘ আলাদা নয়, দুটিই পুঁজিবাদী ব্যব¯’ার অংশ। মনোচিকিৎসক অধ্যাপক মোহিত কামাল বলেন, বিভিন্ন ওয়েবসাইট পর্নোগ্রাফি ধর্ষণের মতো অপরাধ আরও উসকে দি”েছ, এতে মানুষের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ শেষ করে দি”েছ। যারা পর্নোগ্রাফির জগতে ঢুকে পড়ে তাদের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কমে যায়। এতে ধর্ষকরা একজন নারীকে দেখামাত্রই তাকে ‘ভোগ্যপণ্য’ বলে মনে করে। আর সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ক্ষেত্রে শক্তি ও আধিপত্যের প্রভাব এবং অনিয়ন্ত্রিত জৈবিক তাড়নার কারণেই সাধারণত ধর্ষকরা এমনসব জঘন্য অপরাধ করে।
বিশেষ করে করোনা কালিন সময়ে কিশোর ও তর“ণ তথা সমাজের সকল মানুষের ভালভাবে সময় কাটানোর জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও সু¯’ বিনোদনের ব্যব¯’া না থাকায় সমাজে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা বাড়ছে, সেই সাথে চলাচলের শিথিলতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা না পাওয়া, বিচার প্রার্থীর পক্ষে আদলতে স্বাক্ষীর বারবার গিয়ে স্বাক্ষি দেয়ার অনীহা, পারিবারিক ও আত্ম সম্মানের কারনে মামলা না করাসহ মহামারীতে জবাবদিহিতা কম থাকায় ধর্ষণের মতো অপরাধ বেড়ে যা”েছ।
যে দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, প্রধানবিরোধী দলসহ দুই বিরোধীদলীয় নেতাই নারী সে দেশের নারীর অগ্রযাত্রাকে পেছনে ফেলে নারী নির্যাতন অতীতের সকল রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যাওয়ায় সমাজের সুশীল ব্যাক্তিদের অনেকেই আতঙ্কিত। আমরা আশা করব আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে একটা শান্তিময় এবং নিরাপদ সুন্দর পৃথিবী দিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র ও পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের দায়িত্তশীল ব্যক্তি সহ প্রত্যেকের আচার আচরনে কাজে কর্মে শিক্ষাদীক্ষায় সহনশীলতার পরিচয় দিয়ে লোভ লালসা ঊ”ছাকাঙ্খা অত্যাচার অনাচার পরিহার করে নারীরা আরো অধীক স্বচেতন হয়ে পারিবারিক শান্তি সৃঙ্খলা ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কাজ করে যাবে তাতেই নারী নির্যাতনের মাত্রা অনেকটাই কমে যাবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক : সম্পাদক প্রকাশক, অর্থনীতির ৩০ দিন ও মানবাধীকার কর্মী।