কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় : শিক্ষক শ্রেণীকক্ষ সংকট অপূর্ণাঙ্গ গ্রন্থাগার

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি :
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিককার বিভাগ প্রতœতত্ত্ব। স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের পাঁচটি সেশনে বিভাগটিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা দুই শতাধিক। এর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র পাঁচজন। শিক্ষার্থী অনুপাতে পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষক না থাকায় নির্দিষ্ট সময়ে শেষ হচ্ছে না ক্লাস-পরীক্ষা। ফলে সেশনজটে পড়তে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। শিক্ষক স্বল্পতার পাশাপাশি বিভাগটিতে শ্রেণীকক্ষ সংকটও প্রকট। শিক্ষার্থীদের পাঠদানে শ্রেণীকক্ষ রয়েছে মাত্র দুটি। একই সময়ে দুটি ব্যাচের ক্লাস হলে বাকি ব্যাচগুলোকে অপেক্ষায় থাকতে হয়।
শুধু প্রতœতত্ত্ব বিভাগ নয়; শিক্ষক ও শ্রেণীকক্ষ সংকট রয়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো বেশ কয়েকটি বিভাগে। আবার উচ্চশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হওয়ার পরও গড়ে ওঠেনি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থাগার। প্রশাসনিক ভবনের দুটি কক্ষে মাত্র ৮০টি আসন নিয়ে কোনোমতে চলছে গ্রন্থাগারের কার্যক্রম। বই রাখার জন্য প্রয়োজনীয় শেলফও নেই। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠার এক যুগেও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মৌলিক সুবিধা ছাড়াই চলছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়টি।
শিক্ষক সংকট প্রকট যেসব বিভাগে, সেগুলোর আরেকটি নৃবিজ্ঞান। বিভাগটির ছয়টি ব্যাচে শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৩৫০। নয়জন শিক্ষক থাকলেও পাঁচজনই আছেন শিক্ষা ছুটিতে। বর্তমানে বিভাগটিতে কর্মরত শিক্ষক মাত্র চারজন। শিক্ষক সংকটের কারণে এ বিভাগের নিয়মিত কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অনেক ব্যাচেরই ক্লাস, চূড়ান্ত পরীক্ষা সময়মতো হচ্ছে না।
শিক্ষক সংকটে থাকা এসব বিভাগের শিক্ষার্থীদের পড়তে হচ্ছে সেশনজটে। প্রতœতত্ত্ব বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের চতুর্থ সেমিস্টার পরীক্ষা এখনো হয়নি। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগেই একই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের পঞ্চম সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষাও সম্পন্ন হয়েছে।
প্রতœতত্ত্ব বিভাগের প্রধান মো. সাদেকুজ্জামান বলেন, আমাদের পাঁচটি ব্যাচের বিপরীতে মাত্র পাঁচজন শিক্ষক থাকায় শিক্ষকদের ওপর চাপ বেড়ে গেছে। যে কারণে সেশনজট দূর করা যাচ্ছে না। দুটি শ্রেণীকক্ষ রয়েছে, যাতে পাঁচটি ব্যাচের ক্লাস নেয়া কষ্টকর। অন্তত তিনটি হলেও চালিয়ে নেয়া যেত।
শ্রেণীকক্ষ সংকট রয়েছে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগেও। বিভাগটির তিনটি ব্যাচের দেড় শতাধিক শিক্ষার্থীর বিপরীতে শ্রেণীকক্ষ রয়েছে মাত্র একটি। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রধান মাহবুবুল হক ভূঁইয়া বলেন, একটি শ্রেণীকক্ষ দিয়ে তিনটি ব্যাচের শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেয়া খুব কষ্টসাধ্য। অনেক সময় অন্য বিভাগের শ্রেণীকক্ষে গিয়ে আমাদের ক্লাস নিতে হয়। কিন্তু তাদের শিক্ষক চলে এলে পাঠদান অসমাপ্ত রেখেই আমাদের বেরিয়ে আসতে হয়। এছাড়া একটি মাত্র কক্ষ থাকায় পরীক্ষা নিতে গিয়েও বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। অনেক সময় দেখা যায় শুধু কক্ষ না থাকায় পরীক্ষা পেছাতে হচ্ছে। এর বাইরে আইন বিভাগসহ আরো কয়েকটি বিভাগে শিক্ষক ও শ্রেণীকক্ষ সংকট বিদ্যমান।
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার। অথচ প্রতিষ্ঠার ১২ বছরেও একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থাগার গড়ে ওঠেনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রশাসনিক ভবনের পঞ্চমতলায় দুটি কক্ষ নিয়ে কোনোরকমে গ্রন্থাগারের কার্যক্রম চলছে। পর্যাপ্ত জায়গা না থাকার কারণে বইও রাখা যাচ্ছে না।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্র্রশাসনিক ভবনের পঞ্চমতলার একপাশে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। দুটি কক্ষে শিক্ষার্থীদের পড়ার ব্যবস্থা রয়েছে। গ্রন্থাগারটিতে ৮০ জন শিক্ষার্থীর বসার আসন রয়েছে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থী ৬ হাজার ২৮০ জন। গ্রন্থাগারটিতে বই রয়েছে ২০ হাজার, বিভিন্ন রিপোর্ট ও জার্নাল রয়েছে ৯৩৫টি এবং অডিও ভিজ্যুয়াল ম্যাটারিয়ালস ৪০৫টি। এছাড়া গ্রন্থাগারটিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত ফ্যান এমনকি বাতিও নেই।
গ্রন্থাগারের আসন সংকট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ওবায়দুল্লাহ অনিক। তিনি বলেন, যে আসন রয়েছে, তাতে কোনোভাবেই একে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার বলা যায় না। কর্তৃপক্ষ নামমাত্র একটি গ্রন্থাগার দিয়ে নিজেদের দায় সারছে।
এছাড়া শুধু অফিস চলাকালেই খোলা থাকে গ্রন্থাগারটি। এতে শিক্ষার্থীরা যথাযথভাবে এটি ব্যবহার করতে পারেন না। অফিস চলাকালে বাইরের শিক্ষার্থীদের কোনো প্রয়োজন হলেও এটি ব্যবহারের সুযোগ পান না তারা। তাই অন্তত সন্ধ্যাকালীন হলেও গ্রন্থাগারটি খোলা রাখার দাবি শিক্ষার্থীদের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, গ্রন্থাগারটি শুধু ৯টা থেকে ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর এ সময়ের বাইরেও গ্রন্থাগারের প্রয়োজন পড়ে। গ্রন্থাগারটি অন্তত রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকলেও আমাদের সমস্যা কিছুটা কমত।
এদিকে আসবাবের অভাবে প্রায় ১০ লাখ টাকার বই মেঝেতে ফেলে রাখা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীরা যেমন বইগুলো ব্যবহার করতে পারছেন না, তেমনই অযতেœ পড়ে থাকায় এগুলো নষ্ট হচ্ছে। গ্রন্থাগারটিতে জনবলেরও অভাব রয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলে বর্তমানে ১৩ জন গ্রন্থাগারটিতে কর্মরত রয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকেরই গ্রন্থাগারে কাজের দক্ষতা নেই।
গ্রন্থাগারটির দায়িত্বে থাকা ডেপুটি লাইব্রেরিয়ান মহিউদ্দিন মোহাম্মদ তারিক ভূঞা বলেন, আমাদের স্থান ও আসবাবের সংকট রয়েছে। আসবাবের অভাবে আমরা ১০ লক্ষাধিক টাকার বই মেঝেতে ফেলে রাখতে বাধ্য হচ্ছি। জনবলেরও অভাব রয়েছে। জনবল পেলে আমরা সন্ধ্যাকালীন শিফটেও গ্রন্থাগারটি খোলা রাখতে পারব।
বিশ্ববিদ্যালয়টির আবাসন সেবাও নিম্নমানের। শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য হল রয়েছে চারটি। এর মধ্যে ছেলেদের তিনটি ও মেয়েদের জন্য একটি। চারটি হলে সব মিলিয়ে আসনসংখ্যা ৬০০-এর মতো। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়টির ভর্তিকৃত শিক্ষার্থী ৬ হাজার ২৮০ জন। এ হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয়টির ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থীই আবাসন সেবার বাইরে রয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরী বলেন, পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষক ও শ্রেণীকক্ষের পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা নিশ্চিতের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যদিও এর কোনোটিই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই। এসব সংকটের বিষয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আমরা জানিয়েছি। এরই মধ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে এসব সংকট কেটে যাবে। উল্লেখ্য, ২০০৬ সালের ২৮ মে ৫০ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। সাতটি বিভাগ নিয়ে যাত্রা করলেও বর্তমানে বিভাগের সংখ্যা ১৯। এসব বিভাগে কর্মরত শিক্ষক ১৮০ জন।