কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত অনুমোদন

ইজিএম আহ্বান করবে জিএসকে বাংলাদেশ
অর্থনীতির ৩০ দিন প্রতিবেদক :
বাংলাদেশে ফার্মাসিউটিক্যাল ইউনিটের উৎপাদন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে গ্লাক্সোস্মিথক্লাইন (জিএসকে) বাংলাদেশ লিমিটেড। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই কারখানা ও ব্যবসা বন্ধের কার্যক্রম সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বহুজাতিক কোম্পানিটি। তবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি হওয়ার কারণে ফার্মাসিউটিক্যাল ইউনিট বন্ধের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন নিতে হবে। এজন্য বিশেষ সাধারণ সভা (ইজিএম) আহ্বান করবে কোম্পানিটি। ইজিএমে শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন নেয়ার পর নিয়ন্ত্রক সংস্থার কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষে সবকিছু চূড়ান্ত হবে। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে আয়েজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান জিএসকে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা।
সংবাদ সম্মেলনে জিএসকে বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম আজিজুল হক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নকিবুর রহমান, হেড অব কমিউনিকেশন রুমানা আহমেদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
জিএসকে বাংলাদেশের এমডি নকিবুর রহমান সংবাদ সম্মেলনে জানান, গত বৃহস্পতিবার বিকালে কোম্পানির পর্ষদ সভায় বাংলাদেশে কোম্পানিটির ফার্মাসিউটিক্যাল ইউনিটের উৎপাদন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। মূলত গত বছরের মাঝামাঝি থেকেই বিশ্বের উদীয়মান ৮৬টি দেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক মডেল দাঁড় করানোর উদ্যোগ নেয় জিএসকে হেডকোয়ার্টার। এর পরিপ্রেক্ষিতে জিএসকে বাংলাদেশের পর্ষদ এ বছরের শুরুতে স্থানীয় ফার্মাসিউটিক্যাল ব্যবসার ওপর একটি রিভিউ করে। এ রিভিউর ভিত্তিতেই গতকাল কোম্পানিটির পর্ষদ বাংলাদেশে ফার্মাসিউটিক্যাল ইউনিট বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর এ রিভিউ করার সময় কোম্পানির পক্ষ থেকে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে চিঠি দিয়ে অবহিত করা হয়েছে।
কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত কঠিন ও দুঃখজনক হলেও ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে এটিই সঠিক উল্লেখ করে নকিবুর রহমান বলেন, ফার্মাসিউটিক্যাল ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলেও বাংলাদেশে জিএসকের কনজিউমার হেলথ প্রডাক্টের ব্যবসা অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি ইউনিসেফের মাধ্যমে বাংলাদেশে জিএসকের ভ্যাকসিন সরবরাহ কার্যক্রমেও কোনো বিঘ্ন হবে না বলে জানান তিনি। বাজারে জিএসকের উৎপাদিত ওষুধের পর্যাপ্ত বিকল্প পণ্য থাকায় এক্ষেত্রে চিকিৎসক ও রোগীদের কোনো সমস্যা হবে না। তাছাড়া বিদ্যমান চাহিদা মেটাতে কারখানায় পর্যাপ্ত ওষুধ মজুদ রয়েছে। কোম্পানির বাজারজাত করা ওষুধের মেয়াদ থাকা পর্যন্ত জিএসকে ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল কিংবা অন্য কোনো উপায়ে লজিস্টিক সাপোর্ট প্রদান করবে। এজন্য বছর দুয়েকের মতো সময় লাগতে পারে বলে তিনি জানান। তবে ফার্মাসিউটিক্যাল ইউনিট বন্ধের কার্যক্রম এ বছরের ডিসেম্বের মধ্যেই সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত ও ঘোষিত ক্ষতিপূরণ প্যাকেজের বিরুদ্ধে কর্মীদের বিক্ষোভের বিষয়ে তিনি বলেন, যেকোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্যই এটি কঠিন একটি বিষয়। এ সময়ে বিক্ষুব্ধ হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে আমরা একটা বিষয় নিশ্চিত করতে চাই কর্মীদের যৌক্তিক দাবি-দাওয়াগুলো আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করব। ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের যথাযোগ্য সম্মান ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে আমরা বিদায় দিতে চাই। আগামী কয়েক সপ্তাহে আমাদের এসব বিষয় নিয়েই কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশে জিএসকের ফার্মাসিউটিক্যাল ব্যবসা বন্ধের কারণ হিসেবে কোম্পানিটির চেয়ারম্যান এম আজিজুল হক বলেন, আমাদের রেভিনিউর ৭০ শতাংশ আসে কনজিউমার হেলথ প্রডাক্ট বিক্রির মাধ্যমে। বাকি ৩০ শতাংশ হচ্ছে ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্য। কিন্তু বেশ কয়েক বছর ধরেই ফার্মাসিউটিক্যাল ব্যবসায় লোকসান গুনতে হচ্ছে। এতে কনজিউমার হেলথ প্রডাক্ট বিক্রির মুনাফা ফামাসিউটিক্যাল পণ্যের লোকসানের সঙ্গে সমন্বয় করতে হচ্ছিল। জিএসকের ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যের পোর্টফোলিও অনেক পুরনো। বর্তমান বাজারের সঙ্গে এটি অনেকাংশেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আর নতুন করে পোর্টফোলিও পুনর্বিন্যাস করা সম্ভব নয়। ফলে বাংলাদেশ থেকে ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যের ব্যবসা গুটিয়ে নেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। তবে তালিকাভুক্ত কোম্পানি হিসেবে এ সিদ্ধান্তে শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন নিতে হবে। এজন্য ইজিএম করতে হবে। তাছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থার কিছু আনুষ্ঠানিকতাও রয়েছে। তবে ফার্মাসিউটিক্যালের ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে এ খাতে কোম্পানিকে আর লোকসান গুনতে হবে না। ফলে কোম্পানির সমন্বিত আর্থিক প্রতিবেদনে কনজিউমার হেলথ প্রডাক্টের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে ভবিষ্যতে কোম্পানির মুনাফা বাড়বে বলেও মনে করছেন তিনি।
জিএসকে বাংলাদেশে এক হাজারের মতো কর্মী রয়েছে উল্লেখ করে এম আজিজুল হক বলেন, তাদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও সম্মানজনক বিদায়ের বিষয়ে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত সংবেদনশীল। কোম্পানির ফার্মাসিউটিক্যাল কারখানার জমিটি কী কাজে ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। তবে ভবিষ্যতে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
২০১৭ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে, জিএসকে বাংলাদেশের ৮১ দশমিক ৯৮ শতাংশ শেয়ারের মালিক যুক্তরাজ্যভিত্তিক সেটফার্স্ট লিমিটেড। সরকারের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের হাতে ১৩ দশমিক ২৫ শতাংশ, স্থানীয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের হাতে ২ দশমিক ১০, সাধারণ বীমা করপোরেশনের হাতে দশমিক ৬৩ আর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে এর ২ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সর্বশেষ ১ হাজার ২০৫ টাকা ৯০ পয়সায় জিএসকে বাংলাদেশের শেয়ার হাতবদল হয়। ২০১৭ সালে এ কোম্পানির শেয়ারহোল্ডাররা ৫৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ পেয়েছেন। বছর শেষে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ৫৫ টাকা ৫৬ পয়সা ও শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ২১৮ টাকা ৩৫ পয়সা।
দাবি-দাওয়া আদায়ে কমিটি গঠন করেছেন জিএসকের কর্মীরা এদিকে জিএসকে বাংলাদেশের কারখানার শ্রমিকদের বাইরে অন্যান্য বিভাগের কর্মীরা তাদের দাবি-দাওয়া আদায়ের জন্য একটি কমিটি গঠন করেছেন। তারা নিজেদের মধ্যে বৈঠক করে ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছেন। কমিটির সদস্যরা আগামী রোববার কর্মীদের যৌক্তিক দাবি নিয়ে কোম্পানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবেন। কোম্পানি কর্তৃপক্ষ কর্মীদের দাবি-দাওয়া বিবেচনা না করলে আগামী সোমবার থেকে জিএসকে বাংলাদেশের প্রধান কার্যালয়ের সামনে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন তারা।