আসন্ন মুদ্রানীতি ঘিরে প্রত্যাশা

আনোয়ার ফারুক তালুকদার
চলতি মাসের শেষ নাগাদ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির চলতি প্রান্তিকের দ্বিতীয় মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করেছে। এমন অবস্থায় নতুন সরকারের আমলের মুদ্রানীতি কেমন হবে, তা অনেকের কাছে আলোচনার বিষয়। যদিও অনেকেই ভাবছেন, যেহেতু ক্ষমতার কোনো রদবদল হয়নি, তাই আগের সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এ মুদ্রানীতিতে। তবে মন্ত্রিপরিষদে ব্যাপক রদবদল এবং নতুন অর্থমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণ করায় মুদ্রানীতিতে কিছুটা পরিবর্তন এলেও আসতে পারে। নয়া অর্থমন্ত্রী এরই মধ্যে ব্যাংকিং খাত নিয়ে তার কিছু পরিকল্পনার কথা বলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গ, যেটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়। নতুন মুদ্রানীতিতে আশা করা যায়, খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে দিকনির্দেশনা আসবে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বিআইবিএম মিলনায়তনে ‘ইন্টারনাল ক্রেডিট রেটিং সিস্টেম’ নীতিমালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেছেন, ঋণগ্রহীতারা যেন সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে পারে, সে বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে সহযোগিতামূলক ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। বেশকিছু বিদেশী সংস্থা বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে বেশ আশাব্যঞ্জক খবর দিয়েছে। যেমন এডিবি বলছে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ভারতের চেয়ে বেশি হবে। ভারতের হবে ৭ দশমিক ৩ ও বাংলাদেশের ৭ দশমিক ৯ শতাংশ।
অংকের হিসাবে প্রবৃদ্ধির ধারায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকবে বলে খবরে প্রকাশ হয়েছে। এ প্রবৃদ্ধির সুফল ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কমাতে কীভাবে সাহায্য করবে, তা মুদ্রানীতিতে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার গত ডিসেম্বরে ৩৯ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে আছে। ডিসেম্বরে (২০১৮) ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১৩ দশমিক ২০ শতাংশ। চলমান মুদ্রানীতিতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ১৬ দশমিক ৮০ শতাংশ। তাই যে প্রবৃদ্ধির প্রাক্কালন করা হয়েছে, তা অর্জন করতে হলে আসন্ন মুদ্রানীতিতে ব্যাংকের ঋণ বাড়ানোর সুযোগ রাখতে হবে। উৎপাদনশীল খাতে ঋণ গেলে কর্মসংস্থান বাড়বে, অর্থনীতি সচল হবে।
মূল্যস্ফীতি বর্তমানে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে এবং এটি কমার ধারায় রয়েছে। একটি দেশে বেসরকারি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরির জন্য সরকারি বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আমাদের দেশে সরকারি পর্যায়ে বেশ বড় বড় প্রকল্প চলমান রয়েছে। সরকারি বৃহৎ বিনিয়োগের কারণে দেশের প্রবৃদ্ধির গতি দিন দিন বাড়ছে। বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে যেসব বাধা রয়েছে, তা অচিরেই দূর করতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ আমানতের হার ৮৩ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার নির্দেশনার মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো কষ্টসাধ্য হবে। ঋণ আমানতের হার আগের জায়গায় রাখা যায় কিনা, সে বিষয়টি মুদ্রানীতিতে পূর্বাভাস দেয়া যেতে পারে। অন্যদিকে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর আরেকটি সমস্যা ব্যাংক আমানতের কম প্রবৃদ্ধি। সব মিলিয়ে ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি বিশ্লেষণধর্মী মুদ্রানীতি প্রয়োজন। অনেক অর্থনীতিবিদ ব্যাংকিং খাতের এ অবস্থা পর্যালোচনার জন্য ব্যাংকিং কমিশন গঠন করার তাগিদ দিয়েছেন। এ বিষয়ে মুদ্রানীতিতে দিকনির্দেশনা থাকতে পারে। নতুন সরকারের শুরুতে দেশের জন্য প্রবৃদ্ধি সহায়ক মুদ্রানীতি কাম্য। সে কারণে ব্যাপক মুদ্রার প্রবৃদ্ধি, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের দক্ষতা বৃদ্ধিতে আরো কিছু গতিশীল পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।
অধিক মুদ্রা সরবরাহ মূল্যস্ফীতির কারণ বটে, কিন্তু বর্তমানে আমাদের সে পরিস্থিতি নেই। বিদ্যুতের ঘাটতি কমেছে। রফতানি পণ্যে কিছুটা হলেও বৈচিত্র্য এসেছে। তৈরি পোশাক শিল্পের সঙ্গে চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ শিল্পের বাজার সম্প্রসারিত হয়েছে। এ সময়ে মুদ্রা সরবরাহ বাড়লে এখন তা বিনিয়োগে যাবে, যা নিশ্চিতভাবে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সহায়ক হবে। তবে বেসরকারি খাতের ঋণ কোন কোন খাতে কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, সেদিকে নজর দিতে হবে এবং সে বিষয়ে মুদ্রানীতিতে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণ থাকতে হবে। ঋণ যাতে উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার হয়, তার নজরদারি থাকতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। কিন্তু জামানতবিহীন ঋণপ্রাপ্তি এখনো সহজ নয়। ব্যাংকের শাখা গ্রামীণ পর্যায়ে বিস্তৃত হলেও এখনো ব্যাংকঋণ শহুরে শ্রেণীর মধ্যেই পুঞ্জীভূত রয়েছে। ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের জন্য, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কমানোর জন্য গ্রাম পর্যায়ে ঋণ সুবিধা বিস্তৃত করার কোনো বিকল্প নেই।
ব্যাংকগুলোর ঋণ কেনা-বেচায় প্রতিযোগিতায় না গিয়ে নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে প্রতিযোগিতা করা উচিত। আর নতুন উদ্যোক্তা তৈরির জন্য সেরা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা প্রবর্তন করা যেতে পারে। এ মুদ্রানীতিতে এ-জাতীয় কিছু এলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য সুফল আনতে পারে। বিদেশ থেকে ঋণ নেয়ার প্রবণতা কমানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ভালো উদ্যোক্তাদের স্বল্প সুদে ঋণ জোগান দিতে পারে কিনা তা ভেবে দেখা যেতে পারে।
তবে যা-ই করা হোক না কেন, আসন্ন মুদ্রানীতির প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত ব্যবসা-বাণিজ্যবান্ধব। আর একই কারণে কম মূল্যস্ফীতির এ সময়ে সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি অতীব প্রয়োজন। প্রতি প্রান্তিকেই দেখা যায়, প্রান্তিক শুরু হওয়ার প্রথম মাসের শেষ দিকে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়। মুদ্রানীতির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, প্রান্তিক শুরু হওয়ার আগেই ঘোষণা করা হলে এক মাস বেশি সময় হাতে পাওয়া যায়। বিষয়টি কর্তৃপক্ষ বিবেচনায় নিতে পারে।
লেখক : ব্যাংকার