আলোচিত নারী প্রেক্ষাপট

খোন্দকার তাজরি রহমান ঃ
ভাবী সমাচার : আরে ভাবী জানেন কি হয়েছে- আমার ছেলেকে তো বিয়ে করালাম… গতোকাল বুয়াটাকে বিদায়করে দিয়ে ছি… শুধু শুধু মাস শেষে অতগুলো টাকা বুয়াকে দিয়ে কি আর লাভ আছে, যখন বউ ঘরে নিয়ে আসলাম ভাবি… হ্যাঁ ভালোই করলেন… নাহলে বউ কিন্তু আবার মাথায় উঠতো… বেশি ল্যায় দিয়ে দিয়েন না বউ কে… হুম।
পরের জন : ভাবী জানেন, বিয়ের পর আমার ছেলেটা না শুধু বউয়ের কথায় উঠে আর বসে… কি যে যাদু করলো মেয়ে, ত… ছেলেটাকে আমার শেষ করে দিল… আরে ভাবী কি বলেন, এই সব আজ কালকের মেয়েদের অবস্থা… এখনি ব্যবস্থা নেন… নাহলে দুদিন পরে চাল-চুলাই আলাদা করবে…
পাশের জন : আসসালামু আলাইকুম ভাবী, আরে..কেমন আছেন? অনেক দিন পরে দেখা…এই ভাবি আছি আলহামদুলিল্লাহ শরীরটা ভাল ছিলো না… কি বলেন ছেলের বউ থাকতে আর শরীর খরপ হয় কিভাবে…আর বইলেন না: বউয়ের জন্যই আজকে এই অবস্থা… দেখছেন ভাবী প্রথেমই বলেছিলাম না, বেশি ল্যায় দিয়ে মাথায় উঠায়েন না, পরে বুঝবেন কিন্তু…
সামনের জন : ভাবী জানেন না আমার মেয়ের শাশুরীটা না এত্তো চালাক, মেয়েটাকে আমার সারাক্ষণ খাটায়, বিয়ের কদিন পর ঘরের বুয়াটা বিদায় করে দিল… মেয়েটা আমার সব কাজ করে…আমি বলে দিয়েছে, জামাই বাবাকে বল আলাদা হোতে, নাহোলে তুই বাড়ি চলে আয়…।
ডানের জন : ভাবী জানেন – আমার পাশের বাসার ভাবীর ভাইয়ের ছেলের বন্ধুর প্রতিবেশীর বিয়ে হইছে বেশ কয়দিন হইলো, কিন্তু এখনো বাচ্ছা হয়না… কি বলেন ? ছেলেকে আরেকটা বিয়ে করালেই তো পারে, বেচারা ছেলেটা… আর বাবা ডাক শুনতে পারলো না… আপচোস ( একটা দীর্ঘশ্বাস…)
বামের জন : আন্টি আমার নতুন চাকরি হয়েছে… কি লাভ…? মেয়ে মানুষ ঘরেই এ সুন্দর… এওো চাকরি-বাকরি দিয়া হবে কি… সংসার করবা, শশুর-শাশুড়ীর খেদমত করবা, জামাইর মন যুগায় চলবা। এইটাই মাইয়াদের জন্য ঠিক… তো বিয়ে করবা না ??? বয়সতো কম হয় নাই… তো কবে আ র…
পরিচিত জন : আমার মেয়ের বিয়ের দাওয়াত দিতে আসলাম, আসবেন কিন্তু ভাবী…!! কি বলেন ভাবী, এত্তো তারাতারি বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন… পড়াশুনা করবে -চাকরি করবে, একটু ঘুরবে-ফিরবে, এখনি বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন… আজ কালকের মেয়েরা কত্তো এগিয়ে…।
শেষের জন : মিষ্টি খান, আমার নাতনি হয়েছে… ভালোই হলো, এবার কিন্তু তাড়াতাড়ি একটা নাতি দিতে বলেন বউ কে… নাইলে কিন্তুু মিষ্টির মজা নাই…।
আমাদের সমাজের এই ভাবী সম্প্রদায়ের চিরায়তো কথা যে- বিয়ে হয় নাই এখনো, তাড়াতাড়ি বিয়ে করো, বয়সতো কম হয় নাই, হায় আল্লাহ এত্তো তাড়াতাড়ি বিয়ে করে ফেললা; যাক বিয়ে করসো যখস, এখন বাচ্চাটা নিয়ে নাও, তাইলেই হলো… ওম্মা, এত্তো তাড়াতাড়ি বাচ্চা নিয়েনিলা…একটু ঘুরতা-ফিরতা তারপর না হয়; কি বাচ্চা হয়না… দেরি করে নিতে গেলে এমনই হয়… বেচারা ছেলেটার কপালই খারাপ…
এইযে সমাজের সব আঙ্গুলগুলো শুধু নারীদের দিকে এবং আঙ্গুল উঠানো ব্যক্তিতাও একজন নারীই… আমরা নারীরা আরেকজন নারীর পিছে লেগে থাকাকে আমাদের নিত্তো দিনের এন্টারটেইনমেন্ট বানিয়ে নিয়েছি। প্রতিদিন এক-দুইটা গসিপিং না করলেই নয়। একজন নারী হয়ে আরেকজন নারীকে কিভাবে হেনোস্থা করতে হয় তা আমাদের এই ভাবী সম্প্রদায়ই প্রমানিতো…. এই সব কিছু ব্যক্তির কারনে আজ ঘরে ঘরে এত্তো অশান্তি, এত্তো বিবাহ বিচ্ছেদ। একটা সাজানো-গুছানো সংসার কিভাবে কিছু দিনের ব্যবধানেই তস-নস হয়ে যায়।
“জন্মগতভাবে, মহিলারা সেলফিস” – জন্মগত ভাবে একজন নারী আরেকজন নারীর সুখ, সৌন্দর্য, হাসি-খুশি কোন কিছু শয্য করতে পারে না… কেনো তাদের কাছে সে সব কিছু নাই, যা অন্য একজন নারীর কাছে আছে… তারা এত ভাল থাকে, সুখে থাকে কি করে… আমি কেনো পারিনা… আমার কেনো নাই; আমারো চাই” – একটি সুন্দর সংসারকে ধংসের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য এসবই যথেষ্ট…
একদিকে একজন মহিলা তার নিজের মেয়ের ক্ষেএে একরকম চরিত্র বহন করে, আবার ছেলের বউয়ের ক্ষেত্রে আরেক রকম… নিজের মেয়ের বেলায় সব মাফ, কিন্তু ছেলের বউয়ের বেলায় সব কিছু যেনো দন্ডিত অপরাধ। অপরদিকে আবার ছেলের বউরাও তাদের শশুর-শাশুরীকে মেনে নিতে চায় না যা তারা আধুনিক প্রজন্মের মন-মানসিকতার বহি:প্রকাশ বলে মনে করে। আসলে আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটেও বউ-শাশুড়ির দন্দ প্রায় প্রতিটি সংসারে দেখা গেলেও বউ-শশুরের দন্দ্ব তেমোন একটা দেখা যায় না…!
এই যে নারীর প্রতি নারীর যে ইর্শা তার কারনে আজকে আমাদের সমাজের চিত্রটাই ভিন্ন হয়ে গেছে…। আসলে আমরা নারীরাই গোটা সমাজের এমন নষ্ট মন-মানোসিকতা গড়ে তোলার জন্য দায়ি। একটা সংসারে সন্তান মানুষ করা খেকে শুরুকরে একটা সূন্দর জাতি ঘঠন করা পর্যন্ত নারীদের ভূমিকা, চিন্তা, চেতনা অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাই নেপোলিয়ন বোনাপাট বলেছিলেন, “তোমরা আমাকে একজন ভালো মা দাও, আমি তোমাদেরকে একটা ভালো জাতি উপহার দেবো।” এ কথা সত্য যে, যতদিন পর্যন্ত আমরা নারীদের এই মানসিকতা পরিবর্ত্তন না হবে, আমাদের সমাজের এমন হাজারো ছবি সামনে আসতে থাকবে…।
লেখক ঃ ছাত্রী, এলএলএম