খেলাপি ঋণ ৭৫ হাজার কোটি টাকা আদায় অনিশ্চিত

অর্থনীতির ৩০ দিন প্রতিবেদক :
ব্যাংক খাতে আদায় অনিশ্চিত খেলাপি ঋণ বাড়ছে দ্রুত। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই এ ধরনের ঋণ বেড়েছে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। আদায় অনিশ্চিত খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণে বাড়ছে প্রভিশন ঘাটতিও। কারণ, আদায় অনিশ্চিত বা ক্ষতিজনক মানের খেলাপি ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত আদায় অনিশ্চিত খেলাপি বা ক্ষতিজনক মানের খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। যা ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ছিল ৬৪ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। ছয় মাসেই বেড়েছে ১০ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা। জুন শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের ক্ষতিজনক খেলাপির পরিমাণ ৩৬ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা, বেসরকারি ৪০ ব্যাংকের ক্ষতিজনক খেলাপি ঋণ ৩১ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা, বিদেশি ৯ ব্যাংকের ক্ষতিজনক খেলাপি এক হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা এবং সরকারি বিশেষায়িত দুই ব্যাংকের ক্ষতিজনক খেলাপি চার হাজার ১৫৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনিয়ম-দুর্নীতি করে যেসব ঋণ দেওয়া হয়েছে সেসব ঋণ এখন ক্ষতিজনক মানের খেলাপি। তাই ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষতিজনক মানের খেলাপির বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে প্রতি বছর মুনাফা থেকে বড় অঙ্কের প্রভিশন করতে হয়। এতে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়।
এদিকে, আদায় অনিশ্চিত অথবা ক্ষতিজনক মানের খেলাপি ঋণের প্রভাবে বাড়ছে প্রভিশন ঘাটতি। চলতি বছরের জুন শেষে সরকারি-বেসরকারি ১৩টি ব্যাংক প্রভিশন ঘাটতিতে পড়েছে। যার পরিমাণ ১০ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা। যেখানে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে প্রভিশন ঘাটতি ছিল ৯টি ব্যাংকে।
আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, গত কয়েক বছর ধরে সরকারি লোকের দাপটে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে বেশকিছু ঋণ দেওয়া হয়েছিল। যা পুনঃতফসিল করে করে খেলাপি ঋণ ঢেকে রাখা হয়েছিল। এ ধরনের মন্দ ঋণগুলো এখন খেলাপি হয়ে বেরিয়ে আসছে। একইভাবে বেসরকারি ব্যাংকগুলোয়ও কিছু দুষ্ট লোক রয়েছে। তাদের দাপটে যেসব ঋণ দেওয়া হয়েছিল, তা এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সুশাসনের অভাবে ব্যাংকগুলোতে অনিয়ম-দুর্নীতি জেঁকে বসেছে। পরিচালকরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে চান। তাদের কারণে এমডিরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না। আবার ব্যাংকারদের একাংশের অযোগ্যতা-দুর্বলতার কারণেও সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। পরিস্থিতি উন্নয়নে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও কঠোর হতে হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, খেলাপি ঋণ কমাতে হলে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কাঠামো ঠিক করতে হবে। ঋণ দেওয়ার আগে ভালো করে বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে। পুরোনো ঋণগুলো রি-শিডিউলিং করে কোনো কাজ হচ্ছে না। তাই আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়ে তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত করে দেওয়া উচিত। অন্যদিকে, ঋণের টাকা যারা কিছুটা ফেরত দিয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে নমনীয় হওয়া যেতে পারে। এছাড়া বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা ত্বরান্বিত করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ন্যায় বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক প্রভিশন ঘাটতি থেকে বের হতে পারছে না। চলতি বছরের জুন শেষে বেসিক ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক এবং অগ্রণী ব্যাংক প্রভিশন ঘাটতিতে পড়েছে। এছাড়া বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং স্টান্ডার্ড ব্যাংক প্রভিশন ঘাটতিতে পড়েছে।