ফোনালাপ ভাইরাল সাংবাদিক আরিফুলকে আইনী সহায়তার আস্বাস বিএমএসএফ এর
খোন্দকার জিল্লুর রহমান

‘সাংবাদিকেরা জাতির বিবেক’ কথাটি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দায়িত্বশীল লোকের কণ্ঠে শোনা যায়। সমাজের তৃণমূল থেকে রাষ্ট্রের দায়িত্বরত সর্বোচ্চপর্যায় পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রের প্রচার, প্রসার, দুর্নীতি, সমাজনীতি, রাজনীতি, সফলতা, সব কিছুরই উপস্থাপন প্রকাশ হয় সাংবাদিকের কলমের মাধ্যমে। এ জন্যই সাংবাদিকেরা জাতির বিবেক। বিবেক সম্পন্ন জাতী সবসময় বিশ্বে মাথা উঁচু করে চলতে পারে। কিন্তুু জাতির পিতার জন্মশত বার্ষীকিকে সামনে রেখে একজন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি হিসাবে কুড়িগ্রামের ডিসি সুলতানা পারভীনের এমন গহিৃত কান্ড দেশের আইন সৃঙ্খলা, বিচার ব্যাবস্থা, প্রজাতন্ত্রের সকল সরকারি কর্মকর্র্তা কর্মচারি সহ সরকারের মাথা হেট করে দিয়েছে।
কুড়িগ্রামে ডিসি কান্ডে নির্যাতন ও কারাদন্ডের শিকার সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগ্যান। ভ্রাম্যমান আদালতের দেয়া অবৈধ কারাদন্ড, তাকে নির্যাতন, লাঞ্ছিত এবং ভয়ভীতি দেখানোর দৃষ্টান্তমূলক বিচার পেতে আরিফুলের পাশে থাকবে বিএম এসএফ। মঙ্গলবার বিকেলে বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আহমেদ আবু জাফর এক তথ্য সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এদিকে দন্ডপ্রাপ্ত ও নির্যাতনের শিকার আরিফুলের সুচিকিৎসা,পারিবারিক নিরাপত্তা রক্ষার বিষয়টি বিএমএসএফ’র আইন উপদেষ্টা পরিষদ আদালতের নজরে আনবে।
গত ১৩ মার্চ গভীর রাত দেড়টার দিকে কুড়িগ্রামের তৎকালীন দূর্ণীতিবাজ ডিসি সুলতানা পারভীনের নির্দেশে আরডিসি নিজাম উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি পেটোয়া বাহিনী সাংবাদিক আরিফুল ইসলামের বাসার দরজায় গিয়ে পুলিশের লোক বলে খুলতে বলে, না খোলায় লাথি মেরে দরজা ভেঙ্গে ঘরে ঢুকে তাকে উপুর্যূপরি কিলঘুষি ও লাথি মেরে চোখ বেঁধে টেনেহিচড়ে মাইক্রোতে তুলে নেয়। এক পর্যায়ে
ক্রসফায়ারের জন্যও উদ্যত হন তারা। এ সময় আরিফুলের আত্মচিৎকার এবং পা ধরে অণুনয় বিনয়ের পরে ডিসি অফিসে নিয়ে যান। সেখানে একটি রুমে নিয়ে তাকে উলঙ্গ করে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থান রক্তাক্ত ও ফুলা জখম করে ৪টি কাগজে স্বাক্ষর নেয়। ঐ রাত ৩ টায় ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়ে তাকে এক বছরের কারাদন্ড প্রদান করেন। ঐ নিশীরাতের আদালতের রায়ে বলা হয়েছে আরিফুলের বাসায় আধা বোতল মদ ও এক’শ গ্রাম গাঁজা পাওয়া গেছে। এই অভিযোগে তাকে এক বছরের কারাদন্ডাদেশ প্রদান করা হয়।
এদিকে ডিসিকান্ডের ঘটনায় বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামসহ সারাদেশের সাংবাদিক সমাজ প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। এ ঘটনায় বিএমএসএফ’র ডাকে গত ১৬ মার্চ দেশব্যাপী দুই শতাধিক জেলা-
উপজেলায় প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ডিসিকান্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিতে বিএমএসএফ’র আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। ডিসি সুলতানা পারভীন কুড়িগ্রাম থাকাকালে নানা দূর্ণীতি ও অনিয়ম চালিয়ে আসছিলেন। এমনকি তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে ৪০ বছরের একটি ঐতিহ্যবাহি পুকুরের নাম নিজ নামে পরিবর্তন করে সুলতানা সরোবর নামকরন করেন। নিজের সকল দূর্ণীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে আরিফুল বিভিন্ন সময় সংবাদ প্রকাশ করায় তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ডিসি সুলতানা। ওই সংবাদ প্রকাশের জের ধরেই ডিসি সুলতানা পারভীন ১৩ মার্চ গভীর রাতে আরডিসি নিজামের নেতৃত্বে ৪০ জনের একটি টিম পাঠিয়ে সাংবাদিক আরিফুল ধরে এনে কারাদন্ড প্রদান করে ক্ষমতার দাপট দেখাতে চেয়েছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন “ আই এ মনার্ক অব অল আই সার্ভে, মাই রাইট পর দেয়ার ইজ নান-টু ডিস্পুট মি”(একটি ইংরেজি কবিতার লাইন) কিন্তু বিধিবাম! তা আর হলোনা! প্রকৃতপক্ষে দেশের আইন, বিচার ব্যাবস্থা ও অধিকার এখনো বেহাল ও নষ্টাদের হাতে চলে যায় নাই।

বিষয়টি উচ্চ আদালতের নজরে আসায় আরিফুলের বক্তব্য শুনতে আগামি সোমবার হাইকোর্টে ডাকা হয়েছে। ইতিমধ্যে বেনামে জামিন আবেদন করে আরিফুলকে জামিনে বের করে দেয়া হয়েছে। জেল থেকে বেরিয়ে আরিফুল কুড়িগ্রাম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসারত অবস্থায় ডিসি সুলতানা
আরিফুলকে ফোন করে বিষয়টি নিয়ে মিডিয়ার সামনে না আসারও অনুরোধ করে।
গত দু’দিন ধরে আরিফুলের নিকট ডিসি সুলতানা পারভীনের ফোনালাপের অডিও ভাইরালসহ টক অবদা কান্ট্রিতে পরিণত হয়। ‘মামলা তুলে নেব, মিডিয়া অ্যাভয়েড কর’ কুড়িগ্রামে সাংবাদিক আরিফ জেল
থেকে জামিনে বের হওয়ার পর এক ব্যক্তির মাধ্যমে তার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন। এ সময় আরিফকে চুপচাপ থাকার প্রস্তাব দেন জেলা প্রশাসক। একই সঙ্গে এনকাউন্টারে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল না বলে মোবাইল ফোনে আরিফকে তিনি জানান। ফোনে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘এখন মিডিয়াকে অ্যাভয়েড (এড়ানো) করে থাকো। মিডিয়াতে কথা বোলো না। দেখা যাক আল্লাহ ভরসা। তোমার ভবিষ্যৎ নিয়ে আপাতত চিন্তা করার দরকার নাই। ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিয়েও চিন্তা করার কিছু নাই। আমরা তোমার পাশে থাকব। তোমার মামলা প্রত্যাহার করে নেব। একটু সময় দিয়ো। একটু পজিটিভলি দেখতে হবে।’ মোবাইল ফোনে কথোপকথন রেকর্ডে দেখা যায়, আরিফের কাছে ডিসি সুলতানা পারভীন প্রথমে তার অবস্থা জানতে চান। আরিফ তখন তাকে বেধড়ক মারধর কেন করা হয়েছে তা জানতে চান। একই সঙ্গে তার কাছ থেকে চোখ বাঁধা অবস্থায় স্বাক্ষর নেওয়া চারটি কাগজ ফেরত চান। প্রত্যুত্তরে ডিসি সুলতানা পারভীন বলেন, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমাকে ফেরত দেব… কথা বলে নিজে আমি তোমাকে ফেরত দেব… যদি নিয়ে থাকে ওরা। কোন কাগজে সই নিয়েছে। তোমার মোবাইল কোর্টের ইয়াতে সই ছিল, বুঝছো!’ আরিফ এ সময় বলেন, ‘আমার চোখ বাঁধা অবস্থায় চারটা সই নিয়েছে।’ প্রত্যুত্তরে ডিসি বলেন, ‘মোবাইল কোর্টের আদেশে তোমার সই নিয়েছে। ওটা মোবাইল কোর্টের ইয়াতেই। আচ্ছা যা-ই হোক, এখন ঘটনা যেভাবে ঘটে গেছে, যা ঘটেছে তুমিও ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেইখো। আমি নিজেও আসলে অনুতপ্ত। তুমি একটু রেস্ট নাও। যাও। থাকো। নিরিবিলি একটু থাকো, ঠিক আছে!’ আরিফুল ইসলাম রিগান এ সময় তিনি এনকাউন্টারে দেওয়ার মতো অপরাধ করেছেন কি না তা ডিসির কাছে জানতে চান। প্রত্যুত্তরে ডিসি সুলতানা পারভীন বলেন, ‘এনকাউন্টারের মানসিকতা আসলে আমাদের ছিল না। ওইভাবে ছিল না।’ আরিফ ডিসিকে বলেন, ‘আপনি আমাকে একদিন ডাকতে পারতেন, আমি কি আসতাম না?’ এর উত্তরে ডিসি বলেন, ‘না, সেটা আসতা। এখনো আসবা, সমস্যা নাই। এখন ধর যে, কষ্ট তো তুমিও পাচ্ছ, কষ্ট আমিও… হয়ে গেছে যেটা, এটা এদিকে দেখতে হবে একটু পজিটিভলি। এটাই বলার জন্য…।’ আরিফের কাছে ডিসি কী ইচ্ছা জানতে চান। আরিফ এ সময় ডিসিকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘তারা কী উদ্দেশ্যে এ কাজটি করলেন এটা আমার জানা বাঞ্ছনীয়। এবং তারা আমার চারটি কাগজে সই নিয়েছে, কেন নিয়েছে এটা আমার দেখতে হবে। আমার দুই নামেই সই নিয়েছে তারা। এবং আমি আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে খুবই চিন্তিত।’ প্রত্যুত্তরে ডিসি বলেন, ‘তোমার ভবিষ্যৎ নিয়ে এতটা চিন্তিত হওয়ার কিছু নাই। চিন্তিত হওয়ার কিছু নাই ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে, ভালো থাকবা ইনশা আল্লাহ।’ মিডিয়ায় ডাকতে পারে জানালে ডিসি বলেন, ‘এখন কী করতে চাচ্ছ? আমি যেটা বলব যে, এখন মিডিয়াকে অ্যাভয়েড করে থাকো। যাও। দেখা যাক আল্লাহ ভরসা। আমরাও তোমার পাশে আছি আরকি।’

আরিফ এ সময় আবার চোখবাঁধা অবস্থায় স্বাক্ষর করা কাগজের প্রসঙ্গ তুললে ডিসি বলেন, ‘ঠিক আছে আমি খোঁজ নিয়ে দেখি। এটা তো মোবাইল কোর্টের নির্দেশনাতেই ছিল। অন্য কিছুতে নেয়নি। আর তোমার বিষয়ে অত ইয়া তো আমাদের… যা-ই হোক… ঘটনাটা ঘটেছিল।’ মামলা প্রসঙ্গে ডিসি বলেন, ‘তোমার মামলা প্রত্যাহার করে দেব, সমস্যা নাই। একটু সময় দিয়ো। একটা-দুইটা শুনানির সময় লাগবে। তোমার চাকরির ব্যাপারেও আমি দেখব। চাকরির ব্যাপারে কোনো টেনশন কোরো না।’ শুক্রবার মধ্যরাতে জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনের নির্দেশে সিনিয়র সহকারী কমিশনার (রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর) নাজিম উদ্দিনের নেতৃত্বে ৪০ জনের একটি দল বাংলা ট্রিবিউনের সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগানের বাসার দরজা ভেঙে ঢুকে তাকে মারধর করে প্রথমে এনকাউন্টারে দেওয়ার (গুলি করে হত্যা করার) হুমকি দেয়। সেখান থেকে তাকে তুলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে চোখ বেঁধে বিবস্ত্র করে নির্যাতন করা হয়। এরপর ৪৫০ গ্রাম দেশি মদ ও ১০০ গ্রাম গাঁজা সঙ্গে দিয়ে সাজানো মামলায় মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে এক বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয় অধূমপায়ী আরিফকে। চোখ বাঁধা অবস্থাতেই চারটি কাগজে স্বাক্ষরও করতে বাধ্য করা হয় তাকে।
যে জাতি তার বিবেককে হত্যা করে বা খুন করে সে জাতি বিশ্বদরবারে কিভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে? এটা একবারও দায়িত্বশীল লোকেরা ভেবে দেখেছেন কি? সুশীলসমাজের অনেকেই বলেন, ‘রাষ্ট্রে যখন টেরোরিজম হয়, তখন সমাজের এলিট ও অ্যারিস্টোক্রেট পারসনরা কোণঠাসা হয়ে যান।’
বিভিন্ন সময়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিসহ দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বিদেশে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের সাথে করে নিয়ে যান রাষ্ট্রীয় এবং নিজেদের উন্নয়নকার্যক্রম সারা বিশ্বে এবং নিজ দেশের জনগণের দৃষ্টিগোচরে আনার জন্য। সাংবাদিকেরাও এ কাজটি নির্বিঘেœ করে যান। এ কথা মাথায় রেখে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনকারীদের প্রকৃত বিচার করে দেশ ও জাতির বিবেক সমুন্নত রাখা জরুরি।
লেখক : সম্পদক প্রকাশক: আর্থনীতির ৩০ দিন ও মানবাধিকার কর্মী।











