(“দুষ্টি কলম” টা আমাকে ছাড় দেয় না, কেন যে আমার সারাদিন লিখতে ইচ্ছে হয়, সেটা আমি নিজেও বুঝিনা, যখন দেখি পেটে বোমা মারলেও একটি শব্ধ বেরিয়ে আসার কোন যোগ্যতা নাই আমার, তখন বুঝি, আসলে আমাকে দিয়ে কিছুই হবেনা শুধু অন্ন ধ্বংস করা ছাড়া…)

খোন্দকার জিল্লুর রহমান:
গানের সুরটা যেন জীবনের গতিপথে কোথাও কোন একটা বাধাকে অতিক্রম করে এসে নিজেকে একটু চিন্তিত করে তুলল রহমান সাহেবের যাত্রা পথটাকে। তবুও কোন দিকে কোনরকম দৃষ্টিপাত না করে নিজের কার্য হাসিলের লক্ষে সদ্ব্য এইচ এস সি পাস করা মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছেন বিশ্ববিদ্ব্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দিয়ে যাতে বিশ্ব্যবিদ্যালয়ে মেয়েদের হলে একটি সিটের ব্যাবস্থা করে নিশ্চিন্তে বাসায় ফিরতে পারেন এটাই তার একমাত্র উদ্দেশ্য। সন্তানের অগ্রযাত্রায় কোথাও কোন রকম অসুবিদা বা কোন রকম কষ্ট হউক এটা তিনি কখনোই হতে দিতে চান না। মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হলেও পিতৃস্নেহ থেকে যাতে বঞ্চিত না হয় সেজন্য তিনি নিজের সুখ স্বাচ্ছন্দের দিক পরিহার করে সবসময় সন্তানের সুখ স্বাচ্ছন্দের দিকে বেশী খেয়াল রাখতেন।
স্বদ্ব্য এইচ এস সি পাস করা মেয়েকে তার পছন্দমত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তী করিয়ে দেয়ার জন্য যাত্রাপথে যাতে কোন অসুবিদা না হয় সেজন্য ট্রেনের একটা কামরা আগে থেকেই রিজার্ভ করে রাখেন। কখনো কোন গুরুত্তপূর্ণ কাজ বা জীবনের কোন উদ্দেশ্যমুলক অগ্রযাত্রায় কোনরকম ঝামেলা শৃষ্টি হওয়া বা বিমুখ হওয়ার কোন নজির রহমান সাহেবের জীবনে নাই। ব্যাক্তি জীবনের প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির হিসেবটাকে মিলিয়ে আনতে না পারলেও নিজের অতৃপ্ত অবস্থানটাকে কাউকেই বুঝতে দেন না কখনো, এমনকি নিজের সন্তানও যাতে বুঝতে না পারে কোন অভাব অভিযোগ সহ তারা মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত সেই দিকে অত্যদিক স্বচেতন থেকে তিনি সন্তানকে সফল মানুষ হিসাবে গড়ে তোলার দৃষ্টান্ত স্থাপন করার চেষ্টায় অবিচল। তাই সন্তানের জীবনের লক্ষ ও উদ্দেশ্য অনুযায়ী সুন্দর ভবিষ্যত গড়ে তোলার লক্ষে সন্তানের পছন্দমত যে বিষয়ে লেখাপড়া করতে ইচ্ছুক সেই দিকে কাজে লাগানোর অনুপ্রেরনা প্রদানকারি এক বাবা এই রহমান সাহেব।
সন্তানের লেখাপড়া ,অন্যকোন কাজ, কোথাও যাওয়া আসা অথবা কোন পরীক্ষা ইথ্যাদি কাজে সময়ের ব্যাপারে তিনি খুব স্বচেতন, ট্রাফিক জ্যাম,বা অন্য কোন কারনে ষ্টেশানে আসতে যাতে পেরেসানি না হয় সেজন্য এদিন আগেই একটা টেক্সি ঠিক করে রাখেন এবং স্বঠিক সময়েই সকল কাগজপত্র ও প্রয়োজনীয় লাগেজ সহ সন্তান সহ ষ্টেশনে হাজির হন রহমান সাহেব। টেক্সি থেকে নেমে লাগেজ কাঁধে নিয়ে রিজার্ভ করা ট্রেনে উঠার জন্য উল্লেখিত ফ্ল্যাটফরমের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন কিন্তু ট্রেনের দেখা পান না। মনে মনে ভাবলেন মেয়েকে নিয়ে ভুল ফ্ল্যাটফরমে আসলেন কিনা। নিজের স্বচেতনতাবোধ এবং ব্যাক্তিত্তের নিকট প্রশ্ন, আসলেই কি রং নাম্ভারে ডুকে পড়লাম কিনা। তবুও পুনরায় পকেট থেকে রিজার্ভেসনের কাগজটা বের করে দেখে নিলেন রহমান সাহেব। না তো ! ঠিকইতো আছে, তাইলে…। মেয়েকে ফ্ল্যাটফরমের চেয়ারে বসিয়ে রেখে ষ্টেশন মাষ্টার থেকে জেনে নিলেন ট্রেন দুই ঘন্টা লেট। একটু অস্বস্থি বোধ করলেও ষ্টেশন মাস্টারেররুম থেকে বেরিয়ে এসে অপেক্ষমান যাত্রিদের ভীড়ে নিজে নিজে আক্ষেপ করে বলেন হায়রে দূর্ভাগা জাতী, উন্নয়নের রোড ম্যাপে ও মধ্যম আয়ের দেশে পরিনত হয়েও সময় স্বচেতন হওয়ার যোগ্যতা আমরা আজও অর্জন করতে পারিনাই, এ ব্যার্থতা কার?
অপেক্ষমান যাত্রিদের একজন বলল ‘স্যার, যখন টেরেন (ট্রেন) লেইট করে আসে তখন দেরি করি ছাড়ে এডা আমাগো অভ্যাস, পেরাই এরকম অয়’। লোকটার দিকে তাকাতেই লোকটা বুঝতে পারল তার বাংলা ইংরেজি বলার ধরনটা সুন্দর হয় নাই, একটু লজ্জা পাওয়ার মত অবস্তা। অন্য দুএকজন বলল ড্রাইভার এবং গার্ড দুজনে মিলে পথে পথে থামিয়ে স্মাগলিংএর মালামাল ও লোক উঠানামা করে কণ্ট্রাকে টাকা আদায় করে নিজেদের পকেট ভারি করে, সময়ের দিকে তাকায়না। বিভিন্ন জনের বিভিন্ন মতামত শুনে বেরিয়ে এসে ফ্ল্যাটফরমের চেয়ারে লাগেজ সহ অপেক্ষমান মেয়েকে বললেন ট্রেন দুই ঘন্টা লেট হবেরে মা, বসে না থেকে বরং চল এরই ফাকে আসেপাসে কোন রেস্টুরেন্টে খাওয়াদাওয়া সেরে আবার সময়মত এসে ট্রেনে উঠব..। বাবা মেয়ে কথা বলতে বলতে ষ্টেশান থেকে বেরিয়ে এসে ষ্টেশনের অদুরে একটা খাবার হোটেলে গিয়ে ডুকলেন। হোটেলের ভিতরের পরিবেশটা কেমন যেন একটু অন্যরকম বলেই মনে হল, কোন হোটেলবয় বা পরিবেশক হিসেবে কাউকে না দেখে মনে মনে ভাবলেন এটা বোধহয় খাবার হোটেল নয় চল অন্যদিকে যাই। কিন্তুু না .. সুন্দর একজোড়া বাক প্রতিবন্দি এসে পর্দা সরিয়ে রুম দেখিয়ে ওঁ আঁ করে ঈসারায় বসতে বলল। খাবার স্থানগুলি রুম রুম করা পর্দা দেওয়া টেবিল চেয়ারে সাজানো এবং প্রতিটি রুমের সামনে একজেড়া করে দম্পতি,তাও আবার বেশীর ভাগ দম্পতিই বাকপ্রতিবন্ধি বা কোন একটা ব্যাতিক্রমিক অক্ষমতা সম্পন্ন, কিন্তু সকলেই খুব পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি। বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি দেখে বুঝতে পেরেই ঐ দম্পতি সামনে এসে তাদের নিজেদের ভঙ্গিতে হাতমুখ ধোয়ার স্থান দেখিয়ে হাতমুখ ধুয়ে এসে বসতে বলল। আমরাও হাতমুখ ধুয়ে এসে খেতে বসি। রুমগুলির ভিতরে চেয়ার টেবিলে সুন্দর করে সাজানো যেন ঘরোয়া পরিবেশ। টেবিলে রয়েছে খাবার মেনু। মেনু দেখে খাবারের নাম বলতেই ওরা সবকিছু বুঝে নেয়। বাকপ্রতিবন্দি হলেও কাজ করতে করতে ওদের অর্ডার বুজে নেয়ার ক্ষমতায় খুব এক্সপার্ট হয়ে গেছে। স্বামী পুরুষ লোকটি অর্ডার অনুযায়ি খাবার সরবরাহ করে দেয় এবং স্ত্রী মহিলাটি রুমের ভিতর লোকেদের খাবার পরিবেশন করান,যেন একটু ভিন্ন পরিবেশের পারিবারিক ভাবে খাবার দাবারের ব্যবস্থা। খুব তৃপ্ততার সাথে খাবার দাবার পর্ব শেষ করে কাউন্টারে বিল পরিশোধ করে মালিকের সাথে কিছু কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
হোটেল মালিক একজন বয়স্ক ধার্মিক ও স্বজ্জন ব্যাক্তি, নিজের এই ব্যাতিক্রমধর্মী মহতি উদ্বোগ সম্মন্ধে বলতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে কান্নাঁয় ভেঙ্গে পড়েন, বলতে থাকেন নিজের জীবন কাহিনি, বলতে বলতে এক পর্যায়ে এসে শুরু করেন নিজের পারিবারিক জীবনের গল্প। পারিবারিক জীবনে তিনি এক কণ্যা সন্তানের বাবা, ছয় সাত বছর বয়সে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ার সময় টাইপয়েড জ্বর হয়ে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলে বহু চিকিৎসা করেও কোন ফলাফল না পেয়ে শেষ পর্যন্ত মেয়েকে বোবা স্কুলে শিক্ষিত করে বড় করেন। অত্যধিক সুন্দর এবং অসংখ্য গুনের অধিকারি মেয়েকে একসময় প্রচুর টাকাপয়সা খরচ করে ধুমধাম করে বিয়ে দেন বাবা। কিন্তু দু:খ্যের বিষয় বিয়ের কিছুদিন যেতে নাযেতেই লম্পট স্বামী মেয়েকে বিভিন্ন যৌতুক আর টাকাপয়সার জন্য মারধর আর অত্যাচার শুরু করতে থাকে। বিভিন্ন সময় প্রচুর টাকা পয়সা দিয়েও এর থেকে পরিত্রান পায়নাই্। প্রায় প্রতি নিয়তই কারনে অকারনে মারধরের মাত্রা বেড়ে যায়।সহ্য করতে না পেরে মেয়ে আমার একদিন মধ্যরাতের বেলা বাসা থেকে বেরিয়ে নিজের বাসার উদ্দেশ্যে রিক্সায় করে রওয়ানা দেয়। বাসায় আসার পথে মাজ রাতের দিকে বেপোরোয়া গতির একটি মালবাহি ট্রাক মেয়ের রিক্সাকে ধাক্কা মেরে চলে যায়। রিক্সাথেকে সিটকে পড়ে রাস্তাতেই মেয়ের জীবনের গতি শেষ হয়ে যায়। এক্সিডেন্টের শব্দে আশেপাশের কিছু লোকজন এসে মেয়েকে উদ্দার করে হাসপাতালের দিকে নিয়ে যায়, আর কিছু লোকজন ও পুলিশের সহায়তায় ট্রাকটি আটক করে থানায় নিয়ে যায় এবং থানার কয়েকজন দুর্নীতিবাজ পুলিশ কর্মকর্তার জোগসাজসে পয়সার বিনিময়ে আমার মেয়েকে ঘৃন্ন্যতম অপবাদ দিয়ে ড্রাইবার সহ ট্রাকটি ছেড়ে দেয়, আর হাসপাতালে নেয়ার পর ডাক্তার মেয়েকে মৃত ঘোষনা করে। খবর পেয়ে মনে অনেক কষ্ট নিয়ে মেয়ের শশুর বাড়ির কাউকে কিছু না বলে নিজের একমাত্র সন্তানের দাফনসহ সকল কর্ম সম্পন্ন করি।
পৃথিবীর সবছেয়ে ভারি বোঝা হল বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ, সেই ভারি বোঝা বহনের শোক কাটিয়ে নিজের পরিবার সহ এমন একটি মহতি পরিকল্পনা করেন যাতে দেশের এমন প্রতিবন্দি লোকেদের জীবনের উপকার হয় এবং সেই পরিকল্পনা অনুযায়ি খোঁজ করে করে নিজের রেষ্টুরেন্টে এসব প্রতিবন্ধি দম্পতিদের কর্মসংস্থানের ব্যাবস্তা করেন। অন্যদিকে কর্মরত প্রতিবন্ধিদের সাথে কথাবার্তা বলে জানতে পারি তাদের মালিক তাদেরকে নিজের সন্তানের মতই অত্যদিক ভালবাসেন বেতন ভাতায়ও তারা তৃপ্ত ও মালিকের প্রতি বাবার মতই শ্রদ্ধাশীল। হোটেল মালিকও তাদেরকে নিয়ে বেশ ভাল আছেন। এসব মহতি উদ্দেগের কথা শুনতে শুনতে রহমান সাহেবের উক্ত হোটেল মালিকের প্রতি শ্রদ্ধ্যাবোধ বেড়ে যায়, পকেট থেকে উচ্ছপধস্থ সরকারি কর্মকর্তা হিসাবে নিজের একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে দিয়ে বললেন যদি কোন দিন কোন প্রয়োজন হয় স্মরন করবেন। এরই মাঝে প্রায় দেড় ঘন্টার বেশী সময় পেরিয়ে যায় ট্রেনের সময় ঘনিয়ে আসে এবং মেয়েকে নিয়ে ষ্টেশনের ফ্ল্যাটফরমে এসে দাড়ানো ট্রেনের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। 
ট্রেনের কম্পার্টমেন্টে উঠে নিজের রিজার্ভ করা রুমের দিকে এগিয়ে যান এবং দরজার একপার্শ্বে ঘামদিয়ে সাঁটানো নিজের ও মেয়ের নাম দেখে রুমের দিকে ডুকতে গিয়ে একটু থমকে যান কে কে তুমি? মনেহল রহমান সাহেব নিজেকে দেখতে পাচ্ছেন, অনুভব হল সমস্থ শরীর ও মনে এমন একটা নিবিড় শান্তির স্পর্শ্ব বয়ে গেল। কথার শব্দ হারিয়ে গেল রহমান সাহেবের মুখ থেকে, দেখে মনে হল আমার সামনে যেন আরেক আমি দাড়িয়ে আছি মুর্তমান হয়ে। কি হল বাবা যাও.. মেয়ের কথায় স্থম্বি ফিরে আসে রহমান সাহেবের। এই ছেলে কি নাম তোমার ? রনি, হায় আল্লা এ কি আমার মেয়ের নাম জানল কি করে? একটু ভেবা চেকা খেয়ে যান রহমান সাহেব, একটু স্বস্থিরে আবার বললেন কি নাম বললে? রনি, ও তাই বল, দরজার পার্শ্বে নাম দেখেছ.. জি না, খালি দেখে ডুকে পড়েছি স্যরি। ছেলেটার বেরিয়ে যাওয়ার মতিগতি দেখে থামিয়ে দিয়ে বললেন ডুকে পড়েছ যাতে তাহলেতো কথার উত্তর না দিয়ে যেতে পারবেনা বলে আবেগ ও ধমকের সুরে ছেলেটাকে বসতে বললেন রহমান সাহেব। এবার মেয়েসহ নিজেদের লাগেজ ও অন্যান্য জিনিসপত্র গুছিয়ে স্থির হয়ে বসলেন। ছেলেটা অসহায়ের মত একটু কাছুমাছু করে সামনের আসনের এক প্রান্তে জড়োসড়ো হয়ে বসে বার বার আড়চোখে লোকটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বিড়বিড় করে নিজেকে নিজে বলছে, বাবা তো নয় মনে হয় যেন একেবারে বাবার মত প্রভাব খাটিয়ে কথা বলছে। মনে মনে একটু শক্তি ও সাহস সঞ্চয় করে স্থির হয়ে বসতে বসতেই হুইসেল দিয়ে ট্রেন যাত্রা শুরু করল।
খুবই সুন্দর স্মার্ট এবং মায়াবি চেহারায় হালকা হালকা মোছওয়ালা চোখে চিকন গোল্ডেন প্রেমের চশমা আবৃত ছেলেটার মাঝে যেন নিজেকে খুঁজে পেলেন, সবটাই যেন অবিকল নকল একেবারে মনে হয় যেন নিজের প্রতিচ্ছবি। ছেলেটার দিকে তাকিয়ে মনে হল অনেক্ষন কিছুই খায়নাই, আসলে ভাল লাগার কাছে এরকম মনে হওয়াটা স্বাভাবিক কল্পনারই একটা বহি: প্রকাশ। হোটেল থেকে খাওয়া দাওয়া শেষ করে আসার সময় কিছু মাংশ পরোটা সাথেকরে নিয়ে আসেন পরবর্তিতে ট্রেনে খাবারের জন্য। সবকিছু নিজেদের খাবারের ব্যাগে সিটের পার্শ্বে রাখা আছে। ট্রেনে সকল যাত্রিদের গন্তব্য একটাই লাষ্ট ষ্টেশান পর্যন্ত। কোথায় যাবে রনি? ভর্সিটিতে. কোন ইয়ারে পড়? দ্বিতীয় বর্ষ জনপ্রশাসন। খুবই ভাল সাবজেক্ট্। বাবা কি করেন? সেনা বাহীনি কর্মকর্তা, মেজর। মা..? স্কুল শিক্ষিকা, সময় কাটানোর জন্য কেণ্টনমেন্টের একটা স্কুলে শিক্ষকতা করেন। এস এস সি, এইস এস সি রেজাল্ট, উভয়টা জি পি এ ৫.০০ (গোল্ডেন)। ঠিক আছে, ঠিক আছে, রেজাল্ট বেশী ভাল হয় নি.. সামনে আরো ভাল করতে হবে, আবেগ ও বৎসনার সুরে বললেন রহমান সাহেব। জ্বি আঙ্কেল, ছেলেটার মুখে আঙ্কেল স্বব্ধটা শুনে রহমান সাহেবের মনে হল যেন নিজের কাউকে কাছে পেয়েছেন। মেয়েকে বললেন রানি ওকে মাংশ পরটা দাও। ছেলেটা অনেক্ষন না খেয়ে আছে, মুখটা কেমন যেন শুকিয়ে গেছে। ছেলেটা মনে মনে ভাবল আবার আমাকে ডাকল কেন ভুল হয়নিতো কোথাও..। মেয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন ও আমার একমাত্র মেয়ে নাম ‘রানি’। বৃটেনে থাকা অবস্থায় ওর জন্ম হয়, অনেক প্রতিক্ষার পর একটাই সন্তান তাই ওর মা আদর করে ওর নাম রেখেছে রানি। ছেলেটা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবছে, চেহারাটা তো বৃটেনের রানির মতই লাগছে..। এইচ এস সি পাশ করেছে এবার ভার্সিটিতে ভর্তীর পালা তাই।
গন্তব্যে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ট্রেনে রনি ও রানি দুজনে মোটামোটি পরিচিত হয় এবং জেনে নেয় মেয়েদের ডরমেটরিতে কোথায় কিভাবে থাকবে, কিভাবে যাওয়া আশা করবে ও ক্লাস কোথায় হবে সবই জেনে নেয়। ক্রমান্ময়ে এই পরিচিতিই নিজেদেরকে অনেকদুর এগিয়ে নেয়, ভার্সিটিতে উভয়ের সাথে প্রায় দেখা হয় এবং একসাথে সময় কাটায়। দেখতে দেখতে প্রায় তিনটি বছর কেটে যায়, রনির মাস্টার্স শেষবর্ষ পরীক্ষা চলে আসে। ভার্সিটি জীবনের অবসান ঘটতে যাচ্ছে কথাটা মনে হলে কেমন একটা শূন্যতা শুন্যতায় সব যেন এলো মেলো হয়ে যায় আর গুনগুনিয়ে গান আসে তুই ফেলে এসেছিস মন মনরে আমার… তাই জনম গেল হেলায় ফেলায় …। মনে হয় যেন কিছু একটা হারাতে বসেছে। নিজেকে কেন এমন লাগছে তা ঠিক বুঝে উঠতে পারতেছেনা। আসলে গত তিনটি বছর ভার্সিটিতে লেখাপড়া ও বিভিন্ন সময়ে এক সাথে সময় কাটানোর সম্পর্কটা নিজেদের মনের অজান্তে দুজনকে অনেকদুর এগিয়ে নিয়ে গেছে, সরাসরি কেউ কাউকে কিছু না বললেও কেউ কাউকে ছাড়তে পারছেনা। বিনি সুতার মালার মত অদৃশ্য একটা শক্তি যেন তাদের দুজনকে জুগল বন্ধি করে ফেলেছে যেন জোজন জোজন ভালবাসা। রানির অনার্স শেষ করতে করতে রনির মাষ্টার্স শেষ হয়েছে বটে কিন্তু রানির মাষ্টর্স শেষ করতে আরো এক বছর লাগার কারনে রানিকে কিছু বুঝতে না দিয়ে মনে মনে স্থির করে কি ভাবে আরো এক বৎসর কাটানো যায়, নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ি রনি অন্য একটা সাবজেক্টে আবার মাষ্টার্সে ভর্তি হয় এবং দুজনে একসাথে মাষ্টার্স শেষ করে বের হয়।
বছর দেড়েক পুর্বে রনির বাবা মেজর সাহেব তার এক অফিসিয়াল প্রোগ্রামে এসে প্রোগ্রাম সেরে ফেরার পথে ছেলের সাথে দেখা করতে ভার্সিটিতে যান। সে সময় ছেলে মেয়ে ভার্সিটির ক্লাস শেষ করে এক সাথে কথা বলতে বলতে হলের দিকে রওয়ানা দেয়, আচকা বাবাকে দেখে রনি বিষ্মিত কন্ঠে বলে উঠে বাবা তুমি এখানে? ছেলেকে অভয় দান করে মেজর সাহেব বললেন অফিসিয়াল একটা বিশেষ প্রোগ্রাম ছিল বলে আসা, একটু সময় হাতে থাকাতে মনে হল তোমাকে একটু দেখে যাই। বাবার কথা শেস হতে না হতেই রনি বলল ‘ অমাকে আগে একটু ফোন করে জানাবা না যে তুমি এ শহরে আসবা, আমার যে কি ভাল লাগছে, একটু অপ্রস্তুত লাগলেও নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে বাবার পা চুয়ে সালাম করে, বাবা ও রানি আমার সাথে পড়ে হলে যাবে। বাবার দৃষ্টি কোন কিছু এড়ায়নাই..ও তাই। জামান সাহেব ছেলের সাথে কথাবার্তা বলে চলে গেলেন ঠিকই, কিন্তু মনে মনে ফুঁসে রাখলেন এমন একটা মেয়েকেই তিনি মনে মনে খুঁজচেন, যেন তিনি তা পেয়ে গেছেন কোন অবস্থায়ই এমন একটা মেয়েকে ছেলের জন্য হাতছাড়া করা যাবেনা। বাসায় ফিরে স্ত্রীকে আলাপ আলোচনায় সব জানিয়ে রেখে সময়ের কাজ সময়ে করার জন্য অপেক্ষায় আছেন।
দুজনে ভালভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ করে বি সি এস ঊত্তীর্ণ হয়ে ভাল চাকুরিতে ডুকে পড়ে। কিছুদিন পার হওয়ার পর জামান সাহেব ছেলের জন্য মনে মনে চিন্তা ভাবনা করে পরিবারের সাথে কথা বলে অগ্রসর হতে থাকেন। ছেলেকে বললে ছেলে এব্যাপারে আপত্তি রাখলেও শেষপর্যন্ত বাবা মা দুজনেই ছেলের মতামতের বহি:প্রকাশ জানতে পারেন। এত বয়সেও জামান সাহেবের স্ত্রী সেলিনা বেগম নিজেকে স্মার্ট সুন্দর ও পরিপাটি করে রেখেছেন, সংসার জীবনেও তিনি একজন আত্মবিস্বাসি ও সফল নারি। শেষ পর্যন্ত জামান সাহেব ও স্ত্রী সেলিনা বেগমের মতামতে রানির বাবা রহমান সাহেবকে আমন্ত্রণ করেন নিজেদের সরকারি বাসায়। পুর্ব পরিচিত এবং নিজের পছন্দমত ছেলে হওয়াতে রহমান সাহেব কোন অমত না করে মন্ত্রণ রক্ষায় সম্মতি দেন। জীবনের অনেক উত্থান পতন পেরিয়ে গেলেও রহমান সাহেব যেভাবে নিজের ইয়ং বয়সের সেই স্মার্টনেসকে ঠিকই ধরে রেখেছেন আর সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়ে চলে যান জামান সাহেবের বাসায়। দোতলায় লম্বা করিডোর পেরিয়ে খোলা ছাদের মত অনেক বড় বারান্দা, সেখানে গোলাকার টি টেবিল ও চেয়ারে সাজানো। রহমান সাহেবের উপস্থিতিতে জামান সাহেবও একরকম আনন্দিত। অন্যদিকে সেলিনা বেগম নিজ হাতে ছেলের হবু শশুরের জন্য বিভিন্ন রকম খাওয়া দাওয়া তৈরি করেন, নতুন মেহমান বলে কথা। কাজের ফাকে হঠাৎ করেএকটা গ্লাস পড়ে ভেঙ্গে যায়। কুসংস্কারকে বিশ্বাস না করলেও সেলিনা বেগম মৌখিক ভাষায় বলে ফেললেন, আবার আমার কথা কার মনে পড়ল…! দুর থেকে কেমন যেন চেনা চেনা ব্যাক্তি বলেই মনে হচ্ছে বুঝি… হাঁ ঠিক সে ই…।
রহমান ও সেলিনা একই শহরের পাশাপাশি বিল্ডিংয়ে বসবাসকারি দুই সরকারি কর্মকর্তার সন্তান ছিলেন। উভয়ে ভাল ও মেধাবি ছাত্র ছাত্রি হওয়ায় দুজনের প্রতি দুজনের একটা দুর্বলতা তৈরি হয় কিন্তু ছেলের বাবার পদ-পদবি একটু নিম্ন হওয়ায় মেয়ের বাবা কোন আবস্থাতেই এদের সম্পর্ক মেনে নিতে রাজি হন নাই।পারিবারিক সম্মতি নাপেলেও নিজেরা নিজেদের সিদ্ধ্যান্তে অটল থেকে সেই মোতাবেক দুজনে বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে একটি পিকনিকের বাসে উঠেপড়ে। সহপাঠি মনেকরে কেউ কিছু না বললেও নিজেরা নিজেরা একটু হৃতবিহব্বল থাকে। গন্তব্যের কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ পিকনিক বাসটি একটি গর্তে উল্টেপড়ে দুর্ঘটনার স্বিকার হয় এতে ৪/৫ জন মারা যায় এবং বহু লোক আহত হয়। দুর্ঘটনায় রহমান সাহেব মাথায় বেশ আঘাত প্রাপ্ত হয়ে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে কয়েকজন লোক তাকে নিকটবর্তি হাসপাতালে নিয়ে যায়,খবর পেয়ে পরবর্তিতে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠান তার মা বাবা। অন্যদিকে সেলিনা আহত হয়ে কদিন হাসপাতালে থেকে বাড়ী ফিরেন। বেশ কিছুদিন পর পেপারে দুর্ঘটনার কিছু ছবি ও মৃতদের নাম দেখিয়ে সেলিনার বাবা বললেন রহমান বেঁছে নেই, এক্সিডেন্টে তার মৃত্যু হয়েছে। দীর্ঘসময় পরেও রহমানের কোন সন্ধান না পেয়ে অগত্যা বাবার বন্ধুর মাধ্যমে তার এক আত্মিয়ের সাথে (জিনি বর্তমান মেজর জামান) সেলিনার বিয়ে দেন। রহমান ও বিদেশে দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর দেশে এসে সেলিনার খোজ জানতে গিয়ে পেপারে দেখেন, সেই এক্সিডেন্টে সেলিনা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচলে কয়েক বছর নিজেকে একাএকা কাটিয়ে রহমান অন্যত্র বিয়ে করেন এবং এক কণ্যা সন্তানের জনক হন, কিন্তু বিধি বিমুখ। রহমান সাহেবের সূখের সংসার দির্ঘায়ীত হয়নাই। ১৭/১৮ বৎসর সংসার জীবনে এক দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যানসারে তার স্ত্রী দুনিয়া থেকে চির বিদায় নেয়। প্রিয়তমা স্ত্রীকে হারিয়ে নিজের মানষিক কষ্ট নিজের ভিতর চাপিয়ে রেখে আর বিয়ে করেন নাই এবং মেয়ের সূখকেই বরন করে নেন রহমান সাহেব। মাঝে মাঝে স্ত্রীর পছন্ধ করা হেমন্তের গানের দুএকটি লাইন নিজে নিজে সুর করে গাইতেন, জীবনে যদি দ্বীপ জ্বালাতে নাহি পার, সমাধির পরে দ্বীপ জ্বেলে দিও… এখনো কাছে আছি তাইতো বুঝনা,আমিযে তোমার ক ত প্রি য়…। আসলেই যখন বুঝার সময় হয়, তখনই প্রিয়তমা স্ত্রীকে হারান।
সুপ্রসস্থ বারান্দার দক্ষিন দিকটা খোলা সবুজের সমারোহে দক্ষিণা বাতাসের যেন এক উদাশ মনের পাগল করা অনুভুতির মাঝেও নিজেকে পাওয়া না পাওয়ার কেমন একটা অস্থিরতা কাজ করতেছে রহমান সাহেবের ভিতরে। দক্ষিনের খোলা বারান্দার ঠান্ডা হাওয়াও যেন রহমান সাহেবের শরিরটাকে ঠান্ডা করতে পারছেনা, অবিরাম ঘামছেন ঘামতে ঘামতে শরিরটা কেমন যেন দুর্বল হয়ে গেছে। করিডোর দিয়ে বারান্দায় যাওয়ার সময় ভিতর থেকে বহু যুগের পরিচিত কোন একটা কণ্ঠস্বর কানে আসে বলে এই উদ্দিগ্নতার কারণ হয়তো। সকল পরিবেশে মানিয়ে নেয়ার মত তুখোর আত্মবিশ্বাসি রহমান সাহেব। বাসায় ডুকার সাথে সাথেই জামান সাহেব বাসার ভিতর থেকে বেরিয়ে হাত এগিয়ে দিলেন। দুজনে করমর্দন করে সামনে টেবিল চেয়ারে সাজানো বারান্দায় এসে বসলেন। এরই মধ্যে জরিনা চা নাস্তা দিয়ে গেল। চা খেতে খেতে দুজনের কুশল বিনিময় ও আলাপ আলোচনা ভালই জমে উঠেছে বেশ কিছুক্ষন পর্যন্ত। চা খাবার এক পর্যায়ে রহমান সাহেব দেখেন করিডোরে সূদর্শন এবং খুবই স্মার্ট এক ভদ্রমহিলার আগমন, চায়ের চুমুকটায় রহমান সাহেবের নাকে মুখে একটা হেঁচকি উঠে চায়ের কাপটা হাত থেকে পড়ে যায়। স্যরি বলে নিজেকে সামলে নিয়ে নিজেই উঠাতে গেলে জামান সাহেব রহমান সাহেবকে থামিয়ে দিয়ে কাজের মেয়েটাকে দিয়ে পরিস্কার করিয়ে নেন। সামনা সামনি এসে দুজনে থমকে যান, কেহই চোখের পানি ধরে রাখতে পাছিলেননা..। জামান সাহেবের নির্বাক দৃষ্টিযেন সবকিছুকে কিছুক্ষনের জন্য হলেও তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে। অল্পক্ষনের মধ্যেই নিজেরা আবার নিজেদেরকে সামলে নিয়ে পুরোনো আলাপ অলোচনায় ফিরে আসেন। দীর্ঘক্ষন আলাপ আলোচনায় জামান সাহেব জানতে পারেন তাদের পুর্ব সম্পর্কের কথা। তিন জনের আলাপ আলোচনার ফাকে এক সময় জামান সাহেব নিজের ডিউটির কথা বলে তাদের পুরুনো দিনের স্মৃতি চারন করার সুযোগ করে দিয়ে নিজে চলে যান।
নিজেরা বেশ কিছুক্ষন নিশ্চুপ থেকে উভয়ের অতৃপ্ত অবস্থানটাকে স্বাভাবিক করার প্রয়াসে রহমান সাহেব বললেন তুমি…! তুমি বেচে আচো? ভাগ্য তোমাকে আমার জীবন থেকে অনেক দুরে নিয়ে গেছে। মনে পড়ে সেই দুর্ঘটনার কথা, আমি সিটের ডানপার্শ্বে বসার কারনে গাড়ি যখন পল্টি খেয়ে নিচের দিকে পড়ে যাচ্ছে আর আমি সামনের দিকে সিটকে গিয়ে গরম ইঞ্জিন বক্সের সাথে মাথায় ধাক্কাখেয়ে পড়ে যাই আর কিছুই জানিনা। পরে কোথাথেকে কি হয়েগেল কিছুই বলতে পারিনা। তিন বছরের ও একটু বেশী সময় পর যখন দেশে ফিরে আসি তখন অনেক কিছুই উলট পালট হয়ে যায়। জানতে পারি তোমার মৃত্যুর খবর। তখনকার সংগ্রহ করা একটা স্থানিয় পেপারে তোমার নাম দেখতে পাই। অবিশ্বাস্য মনকে জোর করে ঔষধ গিলানোর মত করে বুঝিয়ে নিতে বাধ্য করি। অনেক ঝামেলার পর সরকারি চাকুরিটাও ফিরে পাই। পরবর্তিতে আর কখনো বিয়ে করার পরিকল্পনা না থাকলেও দুই তিন বছর যেতে নাযেতে বাবা মায়ের পিড়াপিড়িতে বৃটেনে বসবাসরত আমাদের দেশীয় একজনকে বিয়ে করতে বাধ্য হই। চিকিৎসা পরবর্তি চেকআপ সুবিদার্থে চার বছরের জন্য বৃটেনে চলে যাই। প্রায় তিন বৎসর প্রতিক্ষার পর প্রথম আমাদের এক কণ্যা সন্তান ঘরে আসে, ওর মা আদর করে নাম রাখেন রানি, এর পর আর আমাদের কোন সন্তান হয়নাই। কিন্তু বিধী বাম, আমাদের সেই সুখের সংসার আনেক বেশি দিন টিকেনাই। ১৭/১৮ বছর সংসার জীবনের এক পর্যায়ে দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যানসারে স্ত্রীর জীবনাবসান ঘটে মেয়েকে নিয়ে আমি হয়ে পড়ি একা জীবনের কান্ডারি। কিন্তুু… কিন্তুু বলতেই সেলিনা তার বুকের ভিতরের ছাইছাপা আগুনকে প্রজ্জলিতকরে বলতে শুরু করেন তার সেইদিনকার শিহরে উঠার মত ধুরধর্ষ ঘটনার কথা। চোখের সামনে থেকে মৃত্যুকে দেখে আসার অভিজ্ঞতা এখনো সেলিনাকে অবর্ননিয় অবস্থায় নিয়ে যায়। সে কি ভয়াবহ দৃশ্য, ডান হাতে তোমাকে ধরব মনে করে হাত বাড়াই, কিন্তুু গাড়ি সামনের দিকে ধাক্কা খেয়ে ঝুকে পড়ায় তোমাকে ধরতে নাপেরে সামনের সিটের হেন্ডেল ধরতে গিয়ে বুকে আঘাত লেগে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি এবং হাতে থাকা হাতবেগটি ছুটে গিয়ে দুই সিঠ সামনে বসা একটি মেয়ের চুলের হাতের চুড়ির সাথে আটকে যায়। মারা যাওয়া আরো চারজন সহ ঐ মেয়েটি বাসের সামনের গ্লাস ভেঙ্গে নিচে পড়ে যায় এবং গাড়ির সামনের চাকায় পিষ্ট হয়ে তার চেহারা বিকৃত হয়ে যায়। নাম ঠিকানা খুঁজে খুঁজে আহত নিহতদেরকে হাসপাতালে ভর্তী করিয়ে দেয় আশেপাশের ঊদ্ধারকারি লোকজন। মেয়েটির হাতে সেঁটে যাওয়া আমার হাতের পার্সটাতে একটা চিঠি লেখা ছিল যা গাড়ি থেকে নেমে বাবাকে পোষ্ট করার জন্য রেখেছিলাম। চিঠিতে লেখা ছিল বাবা, মা কেও বলে দিও তোমাদের একক সিদ্ধান্ত আমরা মেনে নিতে পারলামনা , তাই তোমাদের না বলে আমি আমার পছন্দ করা ছেলের হাত ধরে চলে গেলাম, যদি বেঁচে থাকি এবং তোমাদের মতামত পরিবর্তন করে তোমার জামতাকে গ্রহণ করার অনুমতি পাই তাইলে ফিরে আসব । ইতি, সেলিনা। সেলিনা নাম পেয়ে আমার বাবা মা তাকেই সেলিনা হিসেবে দাফন সস্পন্ন করে। কিন্তুু দুই দিন পর যখন আমার জ্ঞান ফিরে আসে এবং বাবা মাকে খুঁজতে থাকি তখন লোকজন বাবা মাকে ডেকে পাঠায়। বেশ কদিন চিকিৎসার পর বাসায় ফিরে আসি এবং জানতে পারি তোমার মৃত্যু হয়েছে। কোন অবস্থাতেও তা মেনে নিতে না পারলেও পেপারে তোমার নাম দেখতে পেয়ে বিশ্বাস অবিশ্বাসের মাঝে চলতে চলতে প্রায় পাঁচ বছর, অনেক খোঁজ খবরের পর এক সময় জানতে পারলাম পেপারে উল্লেখিত রহমান নামে যে লোকটি মারা গিয়েছিল তিনি রহমান নন,তিনি ছিলেন রায়হান নামের এক ব্যাক্তি এবং আরো জানতে পারি তুমি বেছে আছ। নিজের প্রতি ঘৃনা আর অবিশ্বাস নিয়েও তখন আর আমার করার কিছু ছিলনা। কারণ আমার জানার বৎসর দুই পুর্বে বহু বাধার মুখে একরকম বাধ্য হয়ে জামান সাহেবের সাথে আমার বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যায়। এমন একটা নিস্পাপ নিস্কলঙ্ক ফেরেস্তারুপি মানুষকে না ঠকানোর জন্যই নিজকে নিজে অতৃপ্ত রেখে কাউকে একটুও বুঝতে না দিয়ে সংসারি হয়ে যাই।
সন্ধা গড়িয়ে রাতের দিকে অগ্রসর কাজের মেয়েটা টেবিলে খাবার পরিবেশনের জন্য উপস্থাপন করে সেলিনা বেগমকে বলে যায়। স্মৃতি চারনের ফাকে ছেলের হবু শশুরের জন্য মনোযোগ সহকারে সেলিনার নিজ হাতে রান্নাকরা অনেক প্রকারের খাবার ডাইনিং টেবিলে উপস্থাপন করতে পেরে নিজের কাছে ভালই অনুভব করেন। স্মৃতিচারন করতে করতে তৃপ্তিসহকারে দুজনে রাতের খাবারটাও সেরে ফেলেছেন কিন্তু রহমান সাহেব ও সেলিনা বেগমের সেই স্মৃতিচারনের যেন শেষ নেই, রাত অনেক হয়ে যচ্ছে তবুও দুজনের কথার ভান্ডারে যেন কোন কথার কমতি নেই। রহমান সাহেবের চোখ পড়ে দেয়ালে টাঙ্গানো দেয়াল ঘড়ির দিকে তখন রাত প্রায় ১২টা ছুই ছুই্। দীর্ঘ ২৫/২৬ বছর পর দেখা দুজনের। হারানো জীবনের সেই পাগল করা স্মৃতি দুজনকে যেনো অন্যরকম করে তোলে। দুই দিকে চলে যাওয়া জীবনের গতি যেন নিভৃত হৃদয়ের অতৃপ্ত কামনাকে এক করে দিয়ে সম্পর্কের অবগাহনে ভাসে রহমান সাহেব এবং সেলিনা বেগম, সেলিনা বেগমের দৃষ্টিও দেয়াল ঘড়ির দিকে পড়তেই মুহুর্তেই বাস্তবতায় ফিরে আসেন। নিজেদের জীবনে স্বার্থক হতে না পারলেও নিজের মেয়েকে প্রেমিকার ছেলের সাথে সম্পর্কে কেহই বাধা হয়ে দাড়ান নাই। আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সবরকম আয়োজন ঠিকঠাক করে ছেলে মেয়ে দুজনের সূখি সমৃদ্ধ্য জীবন কামনাকরে সেলিনার ড্রয়িংরুমে সাজানো জামান সাহেবের পছন্দকরা পুরুনো দিনের গ্রামোফোনে রহমান সাহেব একটা রেকর্ডার প্লে করে দিয়ে দুজনের চোখর কোনে জমা অশ্রুবিন্ধুতে জাড়বাতির আলোক বিচ্ছুরন করে আস্তে আস্তে বেরিয়ে যান এবং মনের আবেগে নিজেও গাইতেছিলেন…
তুমি কি সে..ই আগের ম..ত..আ..ছো..
নাকি অ..নে..ক খানি ব ধ..লে.গে..ছো..
খু..ব..জা..ন..তে ই চ্ছে করে..
খু..ব..জা..ন..তে ই চ্ছে করে….
লেখক: সম্পাদক প্রকাশক, অর্থনীতির ৩০ দিন।












